বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:২৩ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক : কথায় আছে চোরের মার বড় গলা। ধরা পড়লে চোর, না পড়লে সাধু। নিজেদের সাধু তৈরি করতে চলছে প্রতিযোগিতা। আর হ্যাঁ যার যত ক্ষমতা আছে তার প্রযোগ তো আছেই। এমনইটাই হচ্ছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ডেসকোর নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশল জগদীশচন্দ্র মন্ডল তার অধীন্যস্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমানের।
এসব প্রকৌশলীরা নতুন সংযোগের নাম করে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির বর্ণনা করে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ ডেসকো বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন আব্দুল আলীম চৌধুরী। মন্ত্রনালয়ে অভিযোগ নাম্বার-৪৩৬৭, তারিখ ২৪ অক্টেবর-২০২৩। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ডেসকোর আওতাধীন নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে ৫০০ কিলোওয়াটের অধিক হলে গ্রাহককে লোড ছাড়পত্র নিতে হয়। এ কাজে মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনের দায়িত্বে নিয়োজিত হাফিজুর রহমান স্বাধীন। ঢাকা শহরের আভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও টঙ্গী শিল্প এলাকার নতুন বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং নতুন নির্মাণকৃত বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগ প্রদানের জন্য যে সকল আবেদনপত্র ডেসকোতে গৃহীত হয়। সেই সকল আবেদনপত্রের মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন শেষে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রাক্কলন প্রদান করে থাকেন। পরবর্তীতে আবেদনকারী বা তাদের প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করে জগদীশচন্দ্র মন্ডলের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী ডিপোজিট কাজকে ডেভেলপমেন্ট দেখিয়ে অথবা চাহিদাকৃত লোড কমিয়ে লোড ছাড়পত্র প্রদানের শর্তে মোটা অংকের অর্থ দাবি করেন। পাশাপাশি ডেসকোর অফিশিয়াল লেটারে নিজের স্বাক্ষরিত মোটা অংকের প্রাক্কলন দেখিয়ে বিভ্রান্ত করে ঘুষ প্রদানে রাজি করেন।
সম্প্রতি, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর নাসির উদ্দিন ইউসুফ নিকট ৮০০ কিলোওয়াট লোডের জন্য লোড সংরক্ষণ ফি ও অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় জমা প্রদান বাবদ ১ কোটি ৫৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪শ’ ১৩ টাকা জমা প্রদানের জন্য ডেসকো হতে পত্র মারফত অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে গ্রাহকের সাথে ১ কোটি টাকার বিনিময়ে ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি পত্রের মাধ্যমে লোড কমিয়ে ৫০০ কিলোওয়াট দেখিয়ে ডেসকোর ১ কোটি ৫৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪শ’ ১৩ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সংযোগ প্রদান করেন। একইভাবে ডেসকোর অধীনস্থ এলাকায় ডেভেলপার কোম্পানি বিটিআই, সান্তা প্রোপাটিজ, এডভান্স ডেভেলপার নির্মিত বহুতল ভবন সমূহের লোড ছাড়পত্র প্রদান এবং টঙ্গী শিল্প এলাকার এসকেএফ ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, আকিজ বেকারী, অলটেক এলমুনিয়াম ইন্ডা. লিমিটেডের লোড ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে ডেসকোর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন।
বিগত পাঁচ বছরে লোড ছাড়পত্রের নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ডেসকোর আনুমানিক ১০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে হাফিজুর রহমান স্বাধীন ও নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী জগদীশচন্দ্র মন্ডল ব্যক্তিগতভাবে ৫০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। জগদীশচন্দ্র মন্ডল বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নাম ব্যবহার করে পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য ও তার আওতাধীন বিভিন্ন প্রজেক্টে তার মনোনীত ঠিকাদারকে কার্যাদেশ প্রদান করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অতি সম্প্রতি সহকারী প্রকৌশলী থেকে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির জন্য তিনজন সহকারী প্রকৌশলীর থেকে সিনিয়রিটির ক্রমানুসার পিছনে ফেলে অবৈধভাবে পদোন্নতির জন্য প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা তথা সর্বমোট ৩০ লাখ টাকা হাফিজুর রহমান স্বাধীনের মাধ্যমে জগদীশচন্দ্র মন্ডল হাতিয়ে নিয়েছেন। যা ডেসকোর সকল কর্মকর্তা কর্মচারীর নিকট দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এছাড়াও কর্মচারী পদোন্নতির ক্ষেত্রে কিছু কর্মচারীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে গ্রহণ করেছেন।
জগদীশচন্দ্র মন্ডল এর আওতাধীন সদ্য সমাপ্ত ৩৩ কেভি আন্ডারগ্রাউন্ড কনভার্শন লাইন প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক মনাভন দত্ত-এর সহযোগিতায় একই ট্রিনসে একাধিক ক্যাবেল ভূগর্ভস্থ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সার্কিট এর নাম করে দফায় দফায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিএনএফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। এডিবির অর্থায়নে ২১০০ শত কোটি টাকার প্রোজেক্টে প্রকল্প পরিচালক জ্যোতিষ চন্দ্র ও হাফিজুর রহমান স্বাধীনের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারের সাথে আঁতাত করে ন্যূনতম হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট পাইয়ে দেওয়ার নাম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের পায়তারা করছেন।
জগদীশচন্দ্র মন্ডল আত্মসাতকৃত অর্থ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচার করেছেন এবং স্বাধীন সেই অর্থ দিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হয়েছে। স্বাধীন ইতোমধ্যে তার চাকরিজীবনের স্বল্প সময়ের মধ্যে ঢাকার ফার্মমেট রাজাবাজার এলাকায় দেশের প্রথম সারির নির্মাণ কোম্পানি সান্তা প্রোপার্টিজে ৩ হাজার বর্গফুট বিশিষ্ট ৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাস বহুল এপার্টমেন্ট ক্রয় করে বসবাস করছেন। এছাড়া এই অল্প সময়ে স্ত্রীর, আত্মীয়-স্বজনের নামে ময়মনসিংহ শহরে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছেন।
উল্লেখ্য, জগদীশচন্দ্র মন্ডল বিএনপি সরকারে থাকলে বিএনপির বেশ ধারণ করে এবং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের বেশ ধারণ করে আসছেন। তার অন্যতম সহযোগী হাফিজুর রহমান স্বাধীন ছাত্র জীবনে রুয়েটে অর্ধানরত অবস্থায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এখন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ-এর নাম ব্যবহার করে নিজেকে দেশের স্বনামধন্য একমাত্র রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন নেতা পরিচয় দিয়ে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার দুর্নীতির জন্য ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) লিমিটেড প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ সকল দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সোচ্চার পদক্ষেপ গ্রহণে জন্য অনুরোধ করা হয়। এই বিষয়ে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ডেসকোর নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশল জগদীশ চন্দ্র মন্ডল এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব তথ্য অস্বীকার করেন। এই বিষয়ে ডেসকোর প্রধান কার্যালয়ের প্ল্যানিং ও ডেভেলপমেন্ট দপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভাই আপনার সঙ্গে দেখা করবো, আমারও অভিযোগ আছে। কিন্তু বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করলেও তিনি কোন যোগাযোগ করেনি।’ এই বিষয়ে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. কাওসার আমীর আলী সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। এই বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব এবং ডেসকো বোর্ডের সভাপতি হাবিবুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।